,

ডুবেছে “ডুব”

মিডিয়ামেইল : দিল্লির প্রেক্ষাগৃহে বাংলা ছবি বলতে গেলে আসেই না। হঠাৎ হঠাৎ খুব ভালো পরিচালকের ছবি বা জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ছবি যাও আসে, শহরে বা শহরের বাইরে অখ্যাত প্রেক্ষাগৃহে বড়জোর এক সপ্তাহ থাকে, দিনে বড়জোর দশ বারো জন বাঙালি দর্শক ছাড়া আর কোনও দর্শক জোটে না।
কলকাতার বাংলা ছবির যদি এই হাল তবে বাংলাদেশের ছবির কী হাল হবে? বাংলাদেশের কোনও ছবি দিল্লিতে এসেছে বলে শুনিনি। তবে আমাদের চমকে দিয়ে বাংলাদেশের মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ডুব ছবিটি দিল্লিতে এসেছে। ইরফান খানের কল্যাণেই নিশ্চয়ই এসেছে এত দূর। পোস্টার জুড়ে ইরফান খান। বাংলাদেশের ছবি দিল্লিতে– আমি তো বিষম  খুশি। ছবিতে ইরফান খান বাংলা বলেছেন—খুশির সীমা নেই আমার। আনন্দবাজারও ছবিটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছে। দিল্লির সাকেত এলাকায় অনুপম প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি দেখলাম। মাথা উঁচু করেই দেখতে গিয়েছি। যথারীতি হাতে গোনা বাঙালি দর্শক। ছবিটা দেখার সময় পাশের দর্শকদের ক্ষণে ক্ষণে বলতে শুনলাম, কী হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আসলে গল্পটা তারাই বুঝবে যারা গল্পটা আগে থেকে জানে। যারা কিছু না জেনে এসেছে, ছবির দৃশ্যগুলোকে জড়ো করে প্রচুর অনুমান এবং কল্পনা মিশিয়ে তবেই আস্ত একটি গল্প তৈরি করতে হবে তাদের।

গত তিরিশ বছর খুব ভালো সিনেমা ছাড়া আমি সিনেমা দেখি না। দেখার আগে রিভিউ পড়ে নিই, বহু বছর হলো রটেন টম্যাটোতে গিয়ে রেটিং দেখে নিই। নিশ্চিন্ত হয়েই তবে সিনেমায় যাই। আজ ডুব দেখে আমি বেশ বুঝেছি, গত তিরিশ বছরে এই প্রথম একটি ছবি আমি দেখলাম, যে ছবি আমাকে সামান্যও স্পর্শ করেনি। আমি সত্যিই বুঝে পারছি না, ইরফান খানের মতো এত বলিষ্ঠ অভিনেতা কী কারণে এমন দুর্বল চিত্রনাট্যের একটি ছবিতে অভিনয় করতে গেলেন, ছবিটির প্রযোজক হতে গেলেন! দশ মিনিটের গল্পকে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বলা হয়েছে, গতিকে তাই মারাত্মক রকম শ্লথ করতে হয়েছে। গল্পটা কী? একটি লোক তার বউ বাচ্চা ত্যাগ করে অল্প বয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে করে, তারপর মরে যায়। এটিই কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্যকে জোড়া দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। এর ওর কান্নাকাটি আর দীর্ঘশ্বাস দর্শক শুধু দেখেছে, বেদনা অনুভব করেনি, কারণ কারও দুঃখে দুঃখী হতে গেলে, বা কারও সুখে সুখী–চরিত্রগুলোকে এবং   সম্পর্কগুলোকে যে গভীরতার ভেতর যেতে হয় তা আদৌ যায়নি।

ছবিটি দেখে আমার মনে হয়েছে লেখক হ‌ুমায়ূন আহমেদের জীবন নিয়েই ছবি করার চেষ্টা করেছেন ফারুকী, তবে কোনও মামলায় আবার না ফেঁসে যান এ কারণে হ‌ুমায়ূন আহমেদকে লেখক না বলে পরিচালক বলেছেন, নামগুলোও বদলে দিয়েছেন, গুলতেকিনের নাম রেখেছেন মায়া, শাওনের নাম রেখেছেন নিতু, আর শীলার নাম সাবেরি। আমার এও মনে হয়েছে, হ‌ুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় বিয়েটি মেনে নিতে পারেননি ফারুকী, তার সব রাগ গিয়ে পড়েছে শাওনের ওপর। ফারুকী  হয়তো প্রতিজ্ঞা করেছিলেন শাওনকে তিনি যে করেই হোক ডোবাবেন। তাই ডুব নামের এই ছবিটি বানিয়েছেন। ফারুকী কিন্তু ছবি তৈরির আগে ইঙ্গিতও দিয়ে দিয়েছেন ছবিটি হ‌ুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে। কপিরাইট ইত্যাদি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কও চলেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ছবিতে জাভেদ হাসান নামের যে হ‌ুমায়ূন আহমেদকে দেখানো হয়েছে, সেই হ‌ুমায়ূন আহমেদ কি আমাদের লেখকহ‌ুমায়ূন আহমেদ? তিনি কি শাওনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাননি? শাওন তাকে বিরক্ত করতেন? প্রেমে শাওন পড়েছিলেন, হ‌ুমায়ূন পড়েননি? ওরকম দূর দূর করে তিনি শাওনকে তাড়াতেন? ছেলেমেয়ের জন্য হ‌ুমায়ূন কাঁদতেন, তাদের কাছে বারবার ছুটে যেতেন?

ফারুকীর এমনই অপছন্দ শাওনকে, যে, ছবিতে তিনি শাওনের সঙ্গে হ‌ুমায়ূন আহমেদের প্রেম হচ্ছে, বিয়ে হচ্ছে, শাওনের বাচ্চা কাচ্চা হচ্ছে, বাচ্চাদের সঙ্গে হ‌ুমায়ূন আহমেদ খেলছেন, স্বামী-স্ত্রী দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বিশাল বাগান বাড়িতে মহানন্দে জীবন কাটাচ্ছেন – দেখাননি।  হ‌ুমায়ূন আহমেদ জীবনে যা করতে ইচ্ছে করেছেন তাই করেছেন, রাজা বাদশাহর মতো বাঁচতে ইচ্ছে হয়েছে তাঁর, ঠিক  তেমন করেই বেঁচেছেন। এসব দেখাননি ফারুকী।  ছবিতে ফারুকী দেখাতে চাননি হ‌ুমায়ূন আহমেদের অসুখ আর তার সেবা যত্নে ব্যস্ত শাওনকে। শাওনকে দেখানো হয়েছে হ‌ুমায়ূন আহমেদের সংসার ভেঙে দেওয়া কোনও বাজে চরিত্রের স্বার্থপর মেয়ে হিসেবে, ‘অ্যাটেনশান সিকার’ হিসেবে– যে কিনা মানুষের সঙ্গে ব্যবহার জানে না, শীলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে শীলার বাবাকে বিয়ে করে শোধ নেয়, যে কিনা শীলাকে তার বাবা কিছু উপহার দিক পছন্দ করে না, যে কিনা বাড়ির কাজের লোকদের খেতে দেয় না। শাওনের প্রতিভার সামান্য কিছুও প্রকাশ করা হয়নি ছবিতে। এ অনেকটা একটা শিশুতোষ ঠাকুরমার ঝুলি, যেখানে রাজা রাণীর সুখের সংসার থেকে রাজাকে এক ডাইনি এসে উঠিয়ে নিয়ে যায়, বাকি জীবন রাণীর শোকে কাঁদতে কাঁদতে রাজা অন্ধ হয়ে যান, আর রাজার অপেক্ষা করতে করতে রাণী বনবাসে যান। শিশুতোষ গল্পটির উপসংহার ফারুকী টেনেছেন এভাবে, জীবনে তারা এক না হতে পারুক, মৃত্যু তাদের এক করে দিয়েছে, তারা একে অপরের কাছে ফিরে এসেছেন, অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলেন।

ছবিটি রক্ষণশীলতার চূড়ান্ত। নিতুকে সকালবেলা দেয়াল টপকে বেরিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, তাতে বুঝে নিতে হবে নিতু রাতে জাভেদ হাসানের সঙ্গে ছিল। রাতে তাদের শয্যাদৃশ্য দেখানো যেত, দেখানো হয়নি। এক সম্পর্ক থেকে আরেক সম্পর্কে গড়িয়ে যাওয়ার যে টানা পোড়েন, যে বিতৃষ্ণা বা যে মোহ – তা ইরফান খান অভিনয় দিয়ে চেষ্টা করলেও নড়বড়ে চিত্রনাট্যের   কারণে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। মায়ার সঙ্গে জাভেদ হাসানের সম্পর্ক একসময় গভীর ভালোবাসার ছিল, তা কোনও দৃশ্যেই বিশ্বাসযোগ্য করা হয়নি।

সিনেমা তৈরি করতে গেলে, বা গল্প লিখতে গেলে, সবচেয়ে বড় যে কাজ পরিচালকের বা লেখকের, তা হলো মানুষের সম্পর্কগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করা, সে যে সম্পর্কই হোক না কেন। ডুব ছবিতে কোনও সম্পর্কই বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। না মায়ার সঙ্গে জাভেদ হাসানের সম্পর্ক, না নিতুর সঙ্গে।

ছবিটিতে ইরফান খানের অভিনয়, যতটুকু করারই সুযোগ পেয়েছেন তিনি, আর সবার চেয়ে ভালো। ইরফান খানের বাংলাও, আমি আশা করিনি এত ভালো হবে। তবে ইরফানকে দিয়ে দুটো বোকা বোকা কাজ করানো হয়েছে। টেলিভিশনে যখন তিনি এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন, কোনও এক প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা উত্তর দিয়েছেন তাতে না ছিল ধার, না ছিল বুদ্ধিমত্তা। আর তার এক ভক্তকে টেনে হিঁচেড়ে নাস্তানাবুদ করার পর ইরফান খান তাকে জিজ্ঞেস করেছেন কেন লোকটি ইরফান খান আর তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে তোলা তার ছবি থেকে স্ত্রীকে বাদ দিয়ে  ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার  দিয়েছে। এ নাকি ইরফানকে রেস্পেক্ট করা নয়। আশ্চর্য, কাউকে শ্রদ্ধা করতে হলে তার স্পাউসকেও শ্রদ্ধা করতে হয় নাকি? হ‌ুমায়ূন আহমেদ হয়তো এমন আত্মম্ভরী আর বদরাগী ছিলেন। কিন্তু ছবির অন্য কোনও দৃশ্যে তা প্রকাশ পায়নি।

ফারুকি আমাকে বেশ কয়েক বছর আগে কিছু চিঠি লিখেছিলেন, আমার নারীবাদী লেখা পড়ে, লিখেছিলেন, তিনি খুব ইনফ্লুয়েন্সড। নারীবাদী ছবি বানাচ্ছেন ঘোষণা দিয়েছিলেন। কী রকম ছিল সেই নারীবাদী ছবি আমার দেখা হয়নি। তার এই ডুব ছবিতে নারীবাদের ন-ও পাইনি। পুরুষটি ভালো, পুরুষটি নিরীহ, পুরুষটি সবাইকে ভালোবাসে, সবাই পুরুষটিকে ভালোবাসে, সবার জন্য তার মন কাঁদে, আর নারীদুটোর মধ্যে একটি ঝগড়াঝাঁটি করে, সন্দেহ করে, জল তেষ্টা পেলে জল দেয় না, আরেকটি সিডিউস করে, ডিস্টার্ব করে, মাথাটা  খায়, হিংসে করে, ধন সম্পত্তি সব  দখল করে নেয়।

ছবিতে কোনও কমপ্লেক্স চরিত্র নেই, সব সাদা কালো, সব সিম্পল। সব পড়া বই। ফারুকী টেলিভিশনের জন্য হাসির নাটক বানাতেন, ওটিতেই মানায় সিম্পল সব কাহিনি, সিম্পল চরিত্র। বড় পর্দায় ছবি করতে গেলে আরও বেশি হাত পাকাতে হবে, আরও গভীর করে জীবনকে দেখতে হবে, মনোস্তাত্বিক জটিলতা আরও জানতে হবে, গল্পের বুনন শিখতে হবে, আরও বড় চিন্তক হতে হবে। যেন তেন কিছু একটা বানিয়ে দিলাম, দু’চারটে পুরস্কার জুটিয়ে নিলাম, লোকে তো খাবেই। লোকে আজকাল সব খাবার খায় না।

ক্যামেরার কাজ ছাড়া প্রশংসা করার মতো খুব বেশি কিছু নেই। ছবির একটি দৃশ্যই আমার ভালো লেগেছে, সেটি ইরফান খান আর পার্নো যখন সিগারেট ভাগাভাগি করে খায়। ওটিতেই হয়তো পরিচালক দুজনের মধ্যে দূরত্ব কমছে বোঝাতে চেয়েছেন। ষাট- সত্তর দশকে বাংলাদেশের সিনেমায় ফুলের ওপর প্রজাপতি দেখিয়ে বোঝানো হতো, নারী পুরুষ চুমু খাচ্ছে। গল্পের জরুরি নানা ঘটনাকে সিম্বল দিয়ে ডুব ছবিতেও বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। ঘটনা দেখাতে অপারগ পরিচালক খামোকা একটি লোকের চা খাওয়ার দৃশ্যকে লম্বা করেছেন, ফেসবুকার ভক্তের হাঁটাকে লম্বা করেছেন, তার দাঁড়িয়ে থাকাকে লম্বা করেছেন, লাশ কবরে নিয়ে যাওয়াকে, জানাজাকে লম্বা করেছেন, তিশার দাঁড়িয়ে থাকাকে, বসে থাকাকে লম্বা করেছেন। জীবনে বহু শ্লথগতির সিনেমা আমি দেখেছি, কিন্তু সেগুলো বড় উত্তেজনায় দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি দেখে, কারণ সেগুলো মস্তিষ্ক নাড়িয়ে দিতে পেরেছে। এই ছবিতে মস্তিষ্কে কোনও আলোড়ন তৈরি করা তো দূরে থাক, স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। আনন্দবাজারে রিভিউয়ার ফারুকীকে তাইওয়ানিজ পরিচালক হাউ সিয়াও সিয়েনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। খুব হাস্যকর তুলনা। সিয়েনের ছবি দেখে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়, নড়ার শক্তি থাকে না।  আর ফারুকীর ছবি দেখে মাথা নিচু করে দ্রুত হল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।

লেখক: তসলিমা নাসরিন, লেখক ও কলামিস্ট

বাংলাট্রিবিউন থেকে সংগ্রহীত

Palash3700

     এই বিভাগের আরও সংবাদ